পৃষ্ঠাসমূহ

Mohadev Shaha লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
Mohadev Shaha লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল, ২০১৫

'Beche achi swapnomanush' by Mohadev Shaha

বেঁচে আছি স্বপ্নমানুষ 

– মহাদেব সাহা


আমি হয়তো কোনোদিন কারো বুকে
জাগাতে পারিনি ভালোবাসা,
ঢালতে পারিনি কোনো বন্ধুত্বের
শিকড়ের একটু জল-
ফোটাতে পারিনি কারো একটিও আবেগের ফুল
আমি তাই অন্যের বন্ধুকে চিরদিন বন্ধু বলেছি;
আমার হয়তো কোনো প্রেমিকা ছিলো না,
বন্ধু ছিলো না,
ঘরবাড়ি, বংশপরিচয় কিচ্ছু ছিলো না,
আমি ভাসমান শ্যাওলা ছিলাম,
শুধু স্বপ্ন ছিলাম;
কারো প্রেমিকাকে গোপনে বুকের মধ্যে
এভাবে প্রেমিকা ভেবে,
কারো সুখকে এভাবে বুকের মধ্যে
নিজের অনন্ত সুখ ভেবে,
আমি আজো বেঁচে আছি স্বপ্নমানুষ।
তোমাদের সকলের উষ্ণ ভালোবাসা, তোমাদের
সকল প্রেম
আমি সারি সারি চারাগাছের মতন আমার বুকে
রোপণ করেছি,
একাকী সেই প্রেমের শিকড়ে আমি
ঢেলেছি অজস্র জলধারা।
সকলের বুকের মধ্যেই একেকজন নারী আছে,
প্রেম আছে,
নিসর্গ-সৌন্দর্য আছে,
অশ্রুবিন্দু আছে
আমি সেই অশ্রু, প্রেম, নারী ও স্বপ্নের জন্যে
দীর্ঘ রাত্রি একা জেগে আছি;
সকলের বুকের মধ্যে যেসব শহরতলী আছে,
সমুদ্রবন্দর আছে
সাঁকো ও সুড়ঙ্গ আছে, ঘরবাড়ি
আছে
একেকটি প্রেমিকা আছে, প্রিয় বন্ধু আছে,
ভালোবাসার প্রিয় মুখ আছে
ভালোবাসার প্রিয় মুখ আছে
সকলের বুকের মধ্যে স্বপ্নের সমুদ্রপোত আছে,
অপার্থিব ডালপালা আছে
আমি সেই প্রেম, সেই ভালোবাসা, সেই স্বপ্ন
সেই রূপকথার
জীবন্তমানুষ হয়ে আছি;
আমি সেই স্বপ্নকথা হয়ে আছি, তোমাদের
প্রেম হয়ে আছি,
তোমাদের স্বপ্নের মধ্যে ভালোবাসা হয়ে আছি
আমি হয়ে আছি সেই রূপকথার স্বপ্নমানুষ।

'Rekhe dio' by Mohadev Shaha

রেখে দিয়ো 

–মহাদেব সাহা

এখানে তোমাদের এই অশ্রুহীন চোখ,
কয়েক লাইন বিদ্যা মুখস্থ করা গম্ভীর মুখ
আর মলাট চিবানো দাঁত দেখতে দেখতে আমি ক্লান্ত;
আমি তাই হাত বাড়িয়ে আছি তাদের দিকে
যারা ডোবা বিল আর পুকুরে পদ্মফুল ফোটায়,

বাংলা সন-তারিখ দিয়ে চিঠি লেখে;

আমি তোমাদের দিকেই তাকিয়ে আছি, যদি পার
একগুচ্ছ তৃণ আর একফোঁটা অশ্রু
আমার জন্য রেখে দিয়ো;
আমি তার গন্ধে মৃত্যুলোক থেকে জেগে উঠতে পারি।

আজ আর আমার শহরের এই অন্ধ
ফুটপাতের কাছে,
এই সব মুখোশ-পরা মুখের কাছে
কিছুই চাওয়ার নেই;
দাঁত আর নখের গর্বে যারা মত্ত তারা কেন
আমার জন্য কখনো চোখের জল ফেলতে যাবে?


তোমরা যারা ডোবা-বিল খেতখামারের লকলকে
ঘাসের মধ্যে ডুবে আছ,
তোমরা যারা গায়ে মাখ পাকা ধানের গন্ধ,
তাদের বলি, আমার জন্য রেখে দিয়ো
একফোঁটা অশ্রু।

'Mognojeeban' by Mohadev Shaha

মগ্নজীবন 

----মহাদেব সাহা

এই এটুকু জীবন আমি দিওয়ানার মতো
ঘুরেই কাটিয়ে দিতে পারি
দিগ্‌ভ্রান্ত নাবিকের মতো অকূল সমুদ্রে পারি
ভাসাতে জাহাজ;
আমার সমগ্র সত্তা পারি আমি সম্পূর্ণ বিলুপ্ত করে দিতে
কোনো সুফী আউলিয়ার মতো
ধ্যানের আলোয়,
ঝরা বকুলের মতো পথে পথে নিজেকে ছড়াতে পারি আমি
ছেঁড়া কাগজের মতো এমনকি যত্রতত্র ফেলে দিতে পারি,
এইভাবে ফেলতে ফেলতে ছড়াতে ছড়াতে এই এটুকু জীবন
আমি পাড়ি দিতে চাই-
এই এটুকু জীবন আমি হেসে খেলে দুচোখের জলে
ভালোবেসে, ভালোবাসা পেয়ে
কিংবা না পেয়ে
এভাবে কাটিয়ে দিতে চাই;
এই ছোট এটুকু জীবন আমি বংশীবাদকের মতো
এভাবে কাটাতে পারি পথে পথে ঘুরে
উদাস পাখির মতো ভেসে যেতে পারি দূর নীলিমায়
সুদূরের স্বপ্ন চোখে নিয়ে,
পারি আমি এটুকু জীবন নিশ্চিত ডুবিয়ে দিতে গানের নদীতে
আনন্দধারায়,
এই তপ্ত এটুকু জীবন আমি স্বচ্ছন্দে ভিজিয়ে নিতে পারি
পানপাত্রে-
ধুয়ে নিতে পারি এই জীবনের সব দুঃখ, অপমান, গ্লানি,
এই পরাজয়, এই অপর ব্যর্থতা, এই অখণ্ড বিরহ,
এই উপেক্ষার অনন্ত দিবসরাত্রি, এই একা একা
নিভৃত জীবন;
এই এটুকু জীবন আমি নির্ঘাত কাটিয়ে দিতে পারি
এভাবে ট্রেনের হুইসেল শুনে
উদাসীন পথিকের মতো পথে, পর্বতারোহীর অদম্য নেশায়
আকাশে ঘুড়ির পানে চেয়ে;
এই মগ্ন জীবন আমি নাহয় নিঃসঙ্গ কয়েদীর মতো
এভাবে কাটিয়ে দিয়ে যাই
অন্ধকারে, অন্ধকারে।

'Amar jeeban' by Mohadev Shaha

আমার জীবন 

–মহাদেব সাহা

আমার জীবন আমি ছড়াতে ছড়াতে
এসেছি এখানে,
আমি কিছুই রাখিনি-
কুড়াইনি তার একটিও ছেঁড়া পাতা,
হাওয়ায় হাওয়ায় উড়িয়ে দিয়েছি শিমুল তুলোর মতো
সব সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনা, স্মৃতি,
আমি এই হারানো জীবন আর খুজি নাই
সেই ফেলে আসা পথে;
ছেঁড়া কাগজের মতো ছড়াতে ছড়াতে এসেছি আমাকে।
পথে পড়ে থাকা ছিন্ন পাপড়ির মতো
হয়তো এখানো পড়ে আছে
আমার হাসি ও অশ্রু,
পড়ে আছে খেয়ালি রুমাল, পড়ে আছে
দুই এক ফোঁটা শীতের শিশির;
এখনো হয়তো শুকায়নি কোনো কোনো অশ্রুবিন্দুকণা,
বৃষ্টির ফোঁটা
চঞ্চল করুণ দৃষ্টি, পিছু ডাক,
হয়তো এখনো আছে সকালের মেঘভাঙা রোদে,
গাছের ছায়ায়
পদ্মাপকুরের স্থির কালো জলে,
হয়তো এখনো আছে হাঁসের নরম পায়ে
গচ্ছিত আমার সেই হারানো জীবন
সেই সুখ-দুঃখ
গোপন চোখের জল।
এখনো হয়তো পাওয়া যাবে মাটিতে
পায়ের চিহ্ন
সেসব কিছুই রাখিনি আমি
ফেলতে ফেলতে ছড়াতে ছড়াতে
এখানে এসেছি;
আমি এই জীবনকে ফ্রেমে বেঁধে রাখিনি কখনো
নিখুঁত ছবির মতো তাকে আগলে রাখা হয়নি
আমার,
আমার জীবন আমি এভাবে ছড়াতে ছড়াতে এসেছি।
আমার সঞ্চয় আজ কেবল কুয়াশা, কেবল ধূসর
মেঘ
কেবল শূন্যতা
আমি এই আমাকে ফ্রেমে বেঁধে সাজিয়ে রাখিনি,
ফুটতে ফুটতে ঝরতে ঝরতে আমি এই এখানে
এসেছি;
আমি তাই অম্লান অক্ষুণ্ন নেই, আমি ভাঙাচোরা
আমি ঝরা-পড়া, ঝরতে ঝরতে
পড়তে পড়তে
এতোটা দীর্ঘ পথ এভাবে এসেছি
আমি কিছুই রাখিনি ধরে কোনো মালা, কোনো ফুল,
কোনো অমলিন স্মৃতিচিহ্ন
কতো প্রিয় ফুল, কতো প্রিয় সঙ্গ, কতো উদাসীন
উদ্দাম দিন ও রাত্রি
সব মিলে হয়ে গেছে একটিই ভালোবাসার
মুখ,
অজস্র স্মৃতির ফুল হয়ে গেছে একটিই স্মৃতির গোলাপ
সব সাম মিলে হয়ে গেছে একটিই প্রিয়তম নাম;
আমার জীবন আমি ফেলতে ফেলতে ছড়াতে ছড়াতে
এখানে এসেছি।

'Tomake likhbo bole ekkhani chithi' by Mohadev Shaha


তোমাকে লিখবো বলে একখানি চিঠি

–মহাদেব সাহা


তোমাকে লিখবো বলে একখানি চিঠি
কতোবার দ্বারস্ত হয়েছি আমি
গীতিকবিতার,
কতোদিন মুখস্ত করেছি এই নদীর কল্লোল
কান পেতে শুনেছি ঝর্ণার গান,
বনে বনে ঘুরে আহরণ করেছি পাখির শিস্
উদ্ভিদের কাছে নিয়েছি শব্দের পাঠ;
তোমাকে লিখবো বলে একখানি চিঠি
সংগ্রহ করেছি আমি ভোরের শিশির,
তোমাকে লেখার মতো প্রাঞ্জল ভাষার জন্য
সবুজ বৃক্ষের কাছে জোড়হাতে দাঁড়িয়েছি আমি-
ঘুরে ঘুরে গুহাগাত্র থেকে নিবিড় উদ্ধৃতি সব
করেছি চয়ন;
তোমাকে লিখবো বলে জীবনের গূঢ়তম চিঠি
হাজার বছর দেখো কেমন রেখেছি খুলে বুক।

'Amar kobitar jonno' by Mohadev Shaha

আমার কবিতার জন্যে 

– মহাদেব সাহা

আমি কবিতা লিখবো বলে এই আকাশ
পরেছে নক্ষত্রমালা,
পরেছে রঙধনু-পাড় শাড়ি, অপরূপ চন্দ্রহার
নদীর গহনা পরে আছে গ্রামগুলি,
শুধু আমি কবিতা লিখবো তাই এই প্রকৃতি
পরেছে পুষ্পশোভা,
কানে পরেছে ফুলের দুল, হাতে ঝিনুকের চুড়ি।
মন হুহু-করা এমন উদাস বাতাস, এমন
স্নিগ্ধ বৃষ্টিধারা
এই ঝর্নার মুখর গান, ফুলের সৌরভ
কেবল আমার কবিতার মধ্যে, আমি কবিতা
লিখবো তাই।

'Smriti' by Mohadev Shaha


স্মৃতি 

–মহাদেব সাহা


সে আসে আমার কাছে ঘুরে ঘুরে যেন এক
স্রোতস্বিনী নদীর সুবাস, ভালোবাসা সে যেন হৃদয়ে শুধু
ঘুরে ঘুরে কথা কয়, চোখের ভিতর হতে সুগভীর চোখের
ভিতরে, সে আসে প্রতিদিন জানালায় ভোরের রোদের মতো
বাহুলগ্ন আমার প্রেমিকা;

সে আসে প্রত্যহ এই আলোকিত উজ্জ্বল শহরে, ইতিহাস
আরো সব কিংবদন্তী কথা কয় আমার স্মৃতিতে, সে আসে
দূর থেকে মনে হয় শ্যামল ছায়ায় ভরা যেন এক
হরিণীর চোখ, অথবা রোদের সুরভিমাখা হেমন্তের শিশির সকাল
সে আসে আমার কাছে নুয়ে পড়ে আমলকী বন;
সে আসে আমার কাছে ভরে ওঠে বছরের শূন্য খামার
নদীতে সহসা ওড়ে মাছরঙ নায়ের বাদাম
ক্ষেতের দরাজ দেহ সিক্ত করে মেঘের মৈথুন,
সে আসে আমার কাছে
ফুটে ওঠে নিসর্গের নিবিড় কদম
সে আসে আমার কাছে ঘুরে ঘুরে নদীর স্রোতের মতো
জলে-ভাসা ভেলা।

সোমবার, ২৩ মার্চ, ২০১৫

'Tumi chole jabe boltei...' by Mohadev Shaha



তুমি চলে যাবে বলতেই...
---মহাদেব সাহা

তুমি চলে যাবে বলতেই বুকের মধ্যে

পাড় ভাঙার শব্দ শুনি-

উঠে দাঁড়াতেই দুপুরের খুব গরম হাওয়া বয়,

মার্সির কাঁচ ভাঙতে শুরু করে;

দরোজা থেকে যখন এক পা বাড়াও আমি

দুই চোখে কিছুই দেখি না-

এর নাম তোমার বিদায়, আচ্ছা আসি, শুভরাত্রি,

খোদা হাফেজ।

তোমাকে আরেকটু বসতে বললেই তুমি যখন

মাথা নেড়ে না, না বলো

সঙ্গে সঙ্গে সব মাধবীলতার ঝোপ ভেঙে পড়ে;

তুমি চলে যাওয়ার জন্যে যখন সিঁড়ি দিয়ে নামতে থাকো

তৎক্ষণাৎ পৃথিবীর আরো কিছু বনাঞ্চল উজাড়

হয়ে যায়,

তুমি উঠোন পেরুলে আমি কেবল শূন্যতা শূন্যতা

ছাড়া আর কিছুই দেখি না

আমার প্রিয় গ্রন্থগুলির সব পৃষ্ঠা কালো কালিতে ঢেকে যায়।

অথচ চোখের আড়াল অর্থ কতোটুকু যাওয়া,

কতোদূর যাওয়া- হয়তো নীলক্ষেত থেক বনানী, ঢাকা থেকে ফ্রাঙ্কফুর্ট

তবু তুমি চলে যাবে বলতেই বুকের মধ্যে মোচড় দিয়ে ওঠে

সেই থেকে অবিরাম কেবল পাড় ভাঙার শব্দ শুনি

পাতা ঝরার শব্দ শুনি-

আর কিছুই শুনি না।